আমার ভাই এবং বোনেরা,আমরা মানুষ । এটা খুবই স্বাভাবিক যে কখনো আমাদের মন খুব ভালো থাকে,আবার কখনো খুব খারাপ। যখন আমাদের মন ভালো থাকে,তখন আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে,কোন জিনিসটা আমার মন ভালো করলো? যদি এটা হয় যে,আপনার সুখী থাকার কারণ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপিত থাকা,তাহলে সে সুখ চিরকাল থাকবে। যদি তা হয় এমন কোন জিনিস,যা দুনিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত,তাহলে মনে রাখবেন,এই সুখ খুব অল্প সময়ের জন্য,আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য এই সুখ কেড়ে নিবেন।এটা হবে। তাই আল্লাহ পরিস্কারভাবে বলেছেন,যদি তোমাকে কিছু দেওয়া হয়,কোন নিশ্চয়তা নেই সেটি সারাজীবন তোমারই থাকবে।
সুরা বাকারার একটা আয়াতে আল্লাহ বুঝিয়েছেন,আমাদের প্রত্যেককেই পরীক্ষা করা হবে ভয়,ক্ষুধা এবং বিভিন্ন ধরণের লোকসানের মাধ্যমে।
এটি বড় একটি আয়াত।কিন্তু আমি আজকে দেখাতে চাচ্ছি যে,আমরা দুঃখ-বিষন্নতার ভুগি।আসলে আমাদের কি করা দরকার? প্রথমে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, ” সৃষ্টিকর্তা,সকল সুখের মালিক আল্লাহর সাথে কি আমার সম্পর্ক ভালো?এটা পরিপুর্ণ?এটা যথোপুযুক্ত? ” উদাহরণস্বরুপ,যদি আমি এমন একজন হই যার সালাতের সাথে কোন সম্পর্ক নেই,কুর’আনের সাথে কোন সম্পর্ক নেই,আল্লাহর সাথে কোন সম্পর্ক নেই।তাহলে কিভাবে আমি এই বিষন্নতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো? আমি আরো দুঃখ পাবো কারণ আমি লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছি। লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছি কি থেকে? এটা হচ্ছে বাস্তবতা,যেখান থেকে আমি এসেছি। এটাকে আমরা আরবীতে বলি ‘দুনিয়া’। এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। এটা বেশীদিন থাকবে না।
দুনিয়া-একটি পরীক্ষাস্থলঃ
প্রকৃতপক্ষে, আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য এখানে পাঠানো হয়েছে। এটা পরীক্ষিত হওয়ার জায়গা। এর প্রমান হচ্ছে,আমাদের কেউই যা চাই তা পাই না,বরং আল্লাহ যা নির্ধারিত রেখেছেন,শুধুমাত্র তাই পাই। তাই তিনি আমাদেরকে শারীরিক,অর্থনৈতিক,পারিবারিক এবং আরো বিভিন্ন বিষয়,বিভিন্ন ধরণের লোকসানের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। অনেক কিছুই ঘটে যা আমরা চাই না কিন্তু আল্লাহ বলেন,অপেক্ষায় থাকো,এটা শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা।আমি দেখতে চাই,তোমার প্রতিক্রিয়া কি।এটা কি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে? এর মাধ্যমে কি তুমি বুঝবে যে এই জীবন খুবই অল্প সময়ের জন্য,একদম ক্ষনস্থায়ী? আজকাল মানুষকে খুবই বিষন্ন দেখি। কিছু সংবাদ আসার সাথে সাথেই তাদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হতে দেখি…আবার তার উল্টোটাও হতে দেখা যায়। আমরা দেখছি যে এটাই হচ্ছে। সুতরাং,তিনিই আল্লাহ, যিনি সব সুখ দেন। খুব দুঃখের মধ্যে থাকার পরেও আপনার মন হঠাৎ খুব ভালো হয়ে যায়। আবার এমনও হতে পারে যে আপনার মন খুব খারাপ হয়ে গেল, এটা বিশ্বাস করার পরেও যে আপনি পৃথিবীতে সবই পেয়েছেন। এটা আল্লাহর ইচ্ছা।লক্ষ্য হারিয়ে ফেলবেন না। তিনিই আল্লাহ।
সালাতে মনোনিবেশ করুনঃ
যাইহোক,যেমনটি আমি বলেছিলাম-যখন আপনার মন খারাপ থাকে,নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে যে আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক কেমন। সেই সম্পর্ক নির্ভর করে আপনার সালাতের প্রতি।প্রাথমিকভাবে,আপনার ৫ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি। আপনি কি আগ্রহের সাথে পড়েন? আমরা দৈনিক পড়ার ক্ষেত্রেও বলছি না যদিও সেটিই হওয়া উচিৎ। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি আগ্রহের সাথে।আপনি কি আগ্রহের সাথে (নামাজের জন্য) অপেক্ষা করেন? আপনি কি বুঝতে পারেন,আপনি কি করছেন? যখন আপনি ৫ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়ছেন,একটু ভাবুন…এটা আপনার সমস্ত দুঃখকে সড়িয়ে দিবে,দুঃখ আপনার মন থেকে চলে যাবে,এটা আপনার বিষন্নতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। শুধুমাত্র এটা ভাবার কারণে যে,আপনি কি করছেন ! কার জন্য আমি মাটিতে সিজদাহ করছি ! কে তিনি ! যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন,যিনি আমার সকল সুখের মালিক ! যিনি আমাকে নিয়ন্ত্রন করেন এবং সবশেষে আমি তার কাছেই ফিরে যাবো ! যখন সবার মতো আমার চোখও বন্ধ হয়ে যায়। এবং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং যাবে আমি ফিরে যাচ্ছি আমার সর্বোচ্চ্য প্রভুর কাছে, যার জন্য আমি আমার মাথাকে মাটিতে রেখেছি(সিজদাহ করেছি),আল্লাহু আকবার ! এটা খুব শক্তিশালী। যদি আপনি বসে ভালোভাবে ভাবেন,শুধুমাত্র সেটাই আপনার সমস্ত বিষন্নতাকে দূর করে দিবে। এমনকি যদি সব কিছুই আপনার ইচ্ছার বিপক্ষে যায়,আপনি নিশ্চিত থাকবেন যে এটা আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হচ্ছে। কোনকিছুই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর ইচ্ছা অনুযায়ী হয়না,এটা আল্লাহরই ইচ্ছা। তাই এটা ভেবে আপনার মন ভালো হয়ে যায় যে ‘হে আল্লাহ,সবকিছুই আপনার ইচ্ছা।আমার চলার পথকে আপনি সহজ করে দিন,আমি আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করতে যাচ্ছি না,প্রতিযোগিতা করতেও পারবো না। কিন্তু আমরা উনাকে ডাকি,তিনি আমাদেরকে সামর্থ্য দান করেন,তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন উপায়ে আমাদের নিজেদেরকে সাহায্য করান এবং আমাদের কাছ থেকে আশা করেন যে আমাদেরকে যা দেওয়া হয়েছে,তার যথোপযুক্ত ব্যবহার করবো,নিজেদেরই সাহায্য করতে। এবং তারপরেও,আমাদেরকে আল্লাহর কাছে সাহয্য চাইতে হবে,দূঃখ দূর করার জন্য। এমনকি আল্লাহর নবী (সাঃ) কে মন খারাপ না করতে বলা হয়েছে,
“হে বার্তাবাহক(রাসুল),অবিশ্বাসীদেরকে আপনার কষ্ট অনুভব করাতে দিবেন না।”
আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে বলছেন,” তাদের কথার দ্বারা আপনার মন খারাপ করবেন না।অনেকেই অনেক কথা বলবে আপনার সম্পর্কে।আপনি কি মনে করেন যে সবাই আপনার মনের ইচ্ছা মোতাবকে চলবে?আপনার সম্পর্কে ভালো কথা বলবে? ” যদি তারা সর্বশ্রেষঠ মানুষ আল্লাহর রাসুলের সম্পর্কেই খারাপ কথা বলতে পারে,তাহলে চিন্তা করে দেখুন,আপনি কে ! আর আমিই বা কে ! সুবহানাল্লাহ ! আমরা কেউই না ! তারা হয়তো আমাদের সম্পর্কে আরো খারাপ কথা বলবে। তাই আল্লাহ বলেছেন,এগুলোর জন্য মন খারাপ করবে না এবং তোমাকে মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ সুবাহানাওয়াতা’য়ালার আরো কাছে আসতে হবে। যেমনটি আল্লাহ রাসুলুল্লাহ(সাঃ) এর মনের কষ্ট সম্পর্কে বলেছেন,কাফিরদেরকে উদ্দেশ্য করে,শুধুমাত্র তারা ইসলামকে মেনে নেয়নি বরং তারা খারাপ কথাও বলেছে। তারা গুজব ছড়িয়েছে,তারা মিথ্যা কথা বলে বেড়িয়েছে ইসলাম সম্পর্কে। আল্লাহ বলেন,আমি জানি যে এসব কথা আপনার মনকে খারাপ করেছে… এই কথাগুলি আপনার মনকে কষ্ট দিচ্ছে,আমি জানি সেটা… কিন্তু আমি আপনার মনকে এটা বলে শান্ত করতে চাই,তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী প্রমান করেনা,তারা জানে আপনি সত্য বলছেন। তারা জানে আপনি আল্লাহর নবী,কিন্তু তারা অহংকারবশত স্বীকার করেনা। অহংকারীকে আপনার মন খারাপ করতে দিবেন না। কখনোই না,যারা আল্লাহকে অমান্য করতেছে,তাদেরকে আপনার মন খারাপ করতে দিবেন না। যারা মিথ্যা গুজব ছড়াতে ভালোবাসে,যাদের স্বভাব খারাপ,যাদের চরিত্র খারাপ,যারা আপনার মনে কষ্ট দেয়। না,যদি আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক অটুট থাকে অথবা আস্তে আস্তে সম্পর্ক আরো ভালো হচ্ছে তাহলে কোন কিছুই আপনার মন খারাপ করতে পারবে না। আপনাকে বলতে হবে,সুবহানাল্লাহ ! এটা আল্লাহর প্রশংসা। আলহামদুলিল্লাহ ! সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য। আল্লাহু আকবার।আল্লাহ সবার থেকে বড়(সবার উপরে)।
আল্লাহকে স্মরণ করুনঃ
এসব কথাগুলোই (আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানা’আল্লাহ্) আপনার মনের কষ্ট দূর করবে,যদি আপনি এই কথাগুলো সঠিকভাবে বলেন। কেননা আল্লাহ বলেন,
” প্রকৃতপক্ষে যারা বিশ্বাস করেছে…এবং তাদেরকেই আল্লাহর কথা মনে করার মাধ্যমে আল্লাহ তাদের মনের কষ্ট দূর করেন।প্রকৃতপক্ষে,আল্লাহর কথা স্মরণ করার মাধ্যমেই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। ”
আপনি অন্তরে শান্তি চান,আপনার মন খারাপ?তাহলে আল্লাহকে স্মরণ করুন। কিভাবে আল্লাহকে স্মরণ করবেন? আমি এসম্পর্কে কিছু কথা বলবো। কারণ এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মানুষ।আমাদের মন খারাপ হয়।কিন্তু একজন বিশ্বাসীকে(মুসলিম) বিষন্নতার প্রতিষেধক দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলোঃ নিয়মিত সালাত আদায় করার অভ্যাস তৈরী করা। সালাতের মান আরো ভালো করুন। ওযু করার জন্য পরিপূর্ণ সময় নিন। আল্লাহর নিকটবর্তী হোন,কিবলার দিকে মুখ করে দাড়ানোর মাধ্যমে। এবং যখন বলবেন ‘আল্লাহু আকবার’,আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কি বলছেন ! আমি বলতেছি আল্লাহ সবার চেয়ে বড়। তিনি আমার জীবনের এই সমস্যা (পরীক্ষা) দিয়েছেন,তিনি প্রকৃতপক্ষেই সবার উর্ধ্বে। আমার আর কি চাওয়ার আছে? তিনি আমার রব। আর আপনি তারই প্রশংসা করছেন,তারই প্রশংসা ঘোষনা করছেন ! এবং আপনি আপনার ইবাদতে মনোনিবেশ করছেন ! যখন আপনি সময় নিয়ে আপনার সালাত শেষ করেছেন এবং বলছেন আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ-আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আপনি মনের মধ্যে একটা প্রশান্তি অনুভব করবেন। নিজের মধ্যে একটা পরিপূর্ণতা অনুভব করবেন।
আপনার মনে হবে যেন এইমাত্র আপনি আপনার রবের সাথে যোগাযোগ করেছেন। যিনি আপনার মালিক,যিনি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। আর কি চান?!