প্রসঙ্গ: মানব জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

সংগ্রহিত (১):
মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব। আশরাফুল মাখলুকাত। প্রাণী জগতের মধ্যে সর্বগুণে গুণান্বিত মানুষ। কাজেই মানুষকে অবশ্যই তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য জেনে নেয়া অপরিহার্য। যদি সে
অন্য সব বিষয়ে মহা পণ্ডিতও হয়ে যায়, আর তার আগমনের আসল উদ্দেশ্য জেনে না নেয় বা হেলায় ভূলে বসে, তাহলে লক্ষ্যচ্যুত তার এ জীবন অবশ্যই সফল হবে না।
মানব জীবনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সঙ্গত কারণেই তিনটি বিষয় সামনে এসে যায়। যথাক্রমে মানুষ কি? মানব জীবন বলতে কি বোঝায়? মানব জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যইবা কি?
মানুষ কি বা তার স্থান কোথায়?
মানবকুল আজ ভূগর্ভ থেকে শুরু করে সৌরজগত সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে নিত্য-নতুন বস্তু আবিস্কার করে চলেছে। আবিস্কার করে চলেছে অচেনা-অজানা অনেক কিছুই। তবে অসংখ্য-অগণিত বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যদিও সে কল্যাণ জনক হাজারো বিষয় জানতে পেরেছে, চিনতে পেরেছে, আবিস্কার করতে পেরেছে, কিন্তু একটি কথা তিক্ত হলেও সত্য যে, নিজেকে নিয়ে গবেষণা করে স্বীয় সত্তাকে আজো চিনতে পারেনি, জানতে পারেনি যে, মানব সত্তা কি? কেন তার আগমন?
মোটকথা, সব বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করলেও সে নিজেকে জানেনি, চিনেনি। অবস্থা এমন যে, মনে করুন কোটিপতি বাবার একমাত্র সন্তান হত্যা মামলার আসামী হয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হল। এখন মাত্র হাইকোর্টে আপীল করার সময়টুকু বাকী রয়েছে, তাও মাত্র এক সপ্তাহ। তাকে হাইকোর্টে আপীল করার জন্য শহরে প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু সে তার শহরে আসার আসল উদ্দেশ্য ভূলে গিয়ে শহরের সৌন্দর্য ও নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গোটা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিভিন্ন স্থাপনা দেখে দেখে চমৎকৃত হচ্ছে, বিভিন্ন লোকের সাথে মত বিনিময় করছে।এভাবেই তার সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল, আপীল করা হল না। বাড়ী ফিরে বলল: শহরের বিভিন্ন দৃশ্য দেখে আর বিভিন্ন লোকের সাথে মত বিনিময় করে সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, আপীল করা সম্ভব হয়নি।
উপরের লোকটির যে অবস্থা বর্তমান মানবজাতির অবস্থাও ঠিক তাই। মানবজাতি যে উদ্দেশ্যে এ ধরায় আগমন করেছে, তার সে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে, বিস্মৃত হয়ে দুনিয়ার চাকচিক্যে নিমগ্ন হয়েছে, বিভোর হয়েছে ভূগর্ভ ও সৌরজগতকে জানার গবেষণায়। এসব কিছুই সে জানতে পারছে, অথচ তার আসল উদ্দেশ্য জানতে আর সময় পাচ্ছেনা।এটা অবশ্যই আক্ষেপের বিষয়। তবে হ্যাঁ, মানবজীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাধনের সাথে সাথে দুনিয়ার জীবনকেও জানতে সক্ষম হলে তো সোনায় সোহাগা, এতে কারো দ্বীমত থাকার কথা নয়।
আজকের দুনিয়ার প্রধান সমস্যাই হচ্ছে, মানবকুল ভূগর্ভ থেকে শুরু করে সৌরজগত ও তদমধ্যস্থিত উদ্ভিদ জগত, প্রাণীজগত ও জড় জগত নিয়ে চিন্তা-গবেষণায় মত্ত হয়েছে, অথচ নিজেকে নিজে ভূলে গেছে। সত্য বলতে কি, যদি কেউ মানব জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাধনে মগ্ন হয়, তখন তাকে দুনিয়ার মানুষ ঠাট্রা বিদ্রূপে জর্জরিত করে। এমন কি শক্তি প্রয়োগ করে তার বিরূদ্ধাচরণ করতেও কুন্ঠাবোধ করে না।
আজকের মানুষ অন্য আরো একটি মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরেছে। আর তা হল: সত্যকে ক্ষমতা ও শক্তির পাল্লায় ওজন করতে শুরু করেছে। যে সত্যের সাথে শক্তি নেই তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। আর যে মিথ্যার সাথে শক্তি প্রচুর, তাকে সত্যরূপে সাব্যস্থ করছে। অর্থাৎ ক্ষমতা ও শক্তিকেই হক্ব-বাতিলের, সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড ধার্য করেছে, যেমনটি পূর্ববর্তী কাফের-বেঈমান নমরূদ, ফেরাউন, হামানেরা আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলগণের সাথে করেছিল। তবে ওদের বেলায় যা হবার তা-ই হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন: বলুন (হে নবী) সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।(সূরা বনি ইসরাইল : ৮১)
স্মর্তব্য যে, ক্ষমতা ও শক্তিকে হক্বের এবং অক্ষমতা ও শক্তিহীনকে বাতিলের মানদণ্ড নির্ধারণ করা মস্তবড় ভূল। কেননা, হক্ব হক্বই হয়ে থাকে যদিও তা অক্ষম ও শক্তিহীনের কন্ঠে উচ্চারিত হোক না কেন? আর বাতিল বাতিলই হয়ে থাকে যদিও তা ক্ষমতাবান ও শক্তিশালীর কন্ঠে উচ্চারিত হোক না কেন? মণি-মুক্তা, হিরা-কাঞ্চন নিঃস্ব-দরিদ্র লোকের হাতে থাকলেও যেমন সেটা অতি মূল্যবান, তার মূল্য কোন অবস্থাতেই হ্রাস পায় না, তেমনি হক্ব-বাতিলের ক্ষেত্রেও।
(চলবে)


মানব জীবনের উদ্দেশ্য কি?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
মানবজাতি কিসের প্রতি অনুপ্রানিত সে বিষয়ে ইসলামের পবিত্র পাঠ্য পুস্তক কোর’আন আলোচনাকরে। একাধিকবার সৃষ্টিকর্তা আলোচনা করেন কিছু বিষয়ে, যেমন পুরুষদের মহিলাদের প্রতি আসক্তি,অথবা অর্থের প্রতি আসক্তি, আথবা সামাজিক পদ মর্যাদার প্রতি আসক্তি, অথবা মানুষ আশা করেএকটি বাসস্থানের মত সুন্দর কোন জিনিস। তাই মানুষ এগুলো পাওয়ার জন্যে কাজ করে, কারনএগুলোর প্রতি তারা প্রবল আসক্তি অনুভব করে।এমনকি আজকালকার দিনেও অনেক যুবক-যুবতীরা হয়ত চায় তাদের ডিগ্রী শেষ করতে অথবা তাদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে অথবা একটিসম্পর্কের সুত্রপাত করতে চায়, যার প্রত্যা্শী তারা ছিল। এ সবগুলো বিষয়ই সবসময় বিদ্যমান আছে,সবসময় বিদ্যমান ছিল। এদের এক ধরণের স্বরূপ আধুনিক কালে বিদ্যমান এবং আরেকটি স্বরূপ পূর্বে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে কোর’আন ঘোষনা দেয় যে, এগুলো মানুষের প্রকৃতলক্ষ্যবস্তু নয় তাই কেউ হয়ত কাজ করে যাচ্ছে নিজেকে বিশেষ আকারে পরিবেশন করার লক্ষ্যে নয়ত কেউ কাজ করে যাচ্ছে অন্য কারো সান্নিধ্য পাওয়ার লক্ষ্যে অথবা তারা কাজ করে যাচ্ছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপর্জানের আশায়। এসবকিছুই আসলে কোন লক্ষ্যবস্তু নয় এগুলো হচ্ছে একটি বৃহত্তরসমাপ্তির মাধ্যম মাত্র। এবং সেই সমাপ্তি… আমরা আমাদের জীবনে যেসকল ক্ষুদ্র মাইলফলক অর্জনকরি তার নির্দেশনা দেয়। প্রকৃতপক্ষে এই জীবন শুধুমাত্র বাস্তব কিছু অর্জন করার জন্যই নয় অথবাশুধু শারীরিক সুখ অর্জনের জন্যও নয়। এই জীবন হচ্ছে সঠিক লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্পর্কে। সঠিকলক্ষ্যবস্তু পাওয়া যায়, যখন আপনি জীবন যাপন করেন শুধুমাত্র আপনার নিজের অবস্থাকে ভালকরার জন্যই নয় বরং আপনার চারপাশের সবকিছু ভাল করার উদ্দেশ্যে। তাই ইসলাম মানে হচ্ছে নিজের ইচ্ছেগুলোকে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার নিকট সমর্পন করা, যেন আপনি নিজেকে চিরস্থায়ী সুখেরজন্য প্রস্তুত করতে পারেন এবং এটা করার মাধ্যমে আপনি এসব পার্থিব সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যের বিসর্জন দেন না, আপনাকে এই জীবনও উপভোগ করতে হবে।  কোর’আনে আছে…….যার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, ‘‘আমি এই পৃথিবীতে তোমাদের ভালভাবে থাকার মাধ্যম তৈরী করে দিয়েছি’’ তাই এই পৃথীবিতেমানবকুলের সুন্দরভাবে জীবন যাপন করার সুযোগ বা অধিকারকে ইসলাম অস্বীকার করে না, তবেএকই সময়ে এই পৃথিবীতে অতিবাহিত প্রতিটি মুহুর্ত… হোক সেটা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দের  জন্যে কিংবা কঠোর পরিশ্রমের জন্যে…  এই ক্ষণস্থায়ী জগতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করা উচিত অন্য কথায় আমি বাঁচি না পরবর্তী মুভীর জন্যে, আমি বাঁচি না পরবর্তী খেলার জন্যে, আমি বাঁচি না পরবর্তীযে ডলারটি আমি আয় করব তার জন্যে।  এসব জিনিষ আসবে আর যাবে। কিন্তু যে জিনিষ কখনওযাবে না তা হচ্ছে আমার সৃষ্টিকর্তার সাথে আমার সম্পর্ক… সবচেয়ে উচ্চতর এবং শক্তিশালী কিছু
। তাই ইসলাম তার মর্মস্থল হতে আপনাকে এবং আমাকে বলছে আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যখুঁজে পেতে এবং সেই উদ্দেশ্য হবে আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁকে খুঁজে বের করা। তারপর লক্ষ্য করা যে, উনি আমাদের কিভাবে জীবন যাপন করতে বলেন। এবং তা করতে অনেকেই মনে করেনযে, এবং এই ব্যাপারটিই আমি আপনাদের বিবেচনার জন্য রেখে দেবো, অনেক মানুষই মনে করে যে,তারা যদি সৃষ্টিকর্তা বানীতে উদ্দেশ্য খুঁজে পায় তাহলে তাদেরকে এমন কিছু জিনিস হতে নিজেদেরবঞ্চিত রাখতে হবে, অন্যথায় যা তারা উপভোগ করতে পারত তাদের উপর আগে কোন প্রতিবন্ধকতাছিল না এখন হঠাৎ করে এইসব আইন-কানুন তাদের জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা হতেবিরত রাখছে বরং তার উল্টোটাই সত্য। বস্তুত যখন কেউ আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাগুলোকেসমার্পন করে এবং আল্লাহর বানীকে স্বীকার করে নেয়, তখন তা যেভাবে বোঝা হাল্কা করে।আসলেকুরআন বলে যে, কিভাবে সৃষ্টিকর্তার দেয়া উপদেশগুলো.. আমরা যদি তা মেনে চলি তবে তিনি আপনার বোঝা হাল্কা করে দেবেন, জীবন আপনার জন্য অনেক সহজতর, অনেক দুর্ভাবনাহীন হয়ে যাবে। আপনি এত শান্তি পাবেন, সমন্বয় খুঁজে পাবেন আপনার এবং আপনার চারপাশের সবার সাথেরসম্পর্কের মাঝে তাই ইসলামে জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে…. আমাদের নিজেদের এবং আমাদেরসৃষ্টিকর্তার মাঝে শান্তি খুঁজে পাওয়া। সত্যিকার ও আন্তরিকভাবে আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁরদাসে পরিনত হওয়ার মাধ্যমে

অনেক ধন্যবাদ পড়ার জন্য।
লেখাটি অনুবাদ করেছেন নোমান আলী খান বাংলা টিম

@templatesyard